সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় আজ জাতীয় টেলিভিশন ও প্রধান সংবাদমাধ্যমে নতুন 'সবার জন্য সঞ্চয়পত্র' চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। এই সঞ্চয়পত্রের মূল বৈশিষ্ট্য হল, সর্বনিম্ন ক্রয়মূল্য একশো টাকা থেকে শুরু করে, কোনো বয়সসীমা বা আয় সীমা নির্ধারণ করা হয়নি, ফলে দেশের প্রতিটি নাগরিক, গ্রামীণ কৃষক থেকে শহরের কর্মচারী পর্যন্ত, সহজে এতে অংশ নিতে পারবেন। সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ পাঁচ বছর, এবং মেয়াদ শেষে মূলধনসহ ৭.৫ শতাংশ সুদ প্রদান করা হবে, যা বর্তমান বাজারের স্থির আমানত হারকে ছাড়িয়ে যাবে। সরকার এই উদ্যোগকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়িয়ে দেশের সঞ্চয় সংস্কারকে ত্বরান্বিত করার প্রধান পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

পূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ধরণের সঞ্চয় পণ্য চালু করলেও, উচ্চ ন্যূনতম জমা এবং জটিল শর্তাবলীর কারণে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত ছিল। বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যাংক শাখার অভাব এবং আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি সঞ্চয়কে বাধাগ্রস্ত করত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়ার ফলে, গৃহস্থালির সঞ্চয় হার কমে যাওয়া এবং ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া দেখা গিয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার আর্থিক অন্তর্ভুক্তি পরিকল্পনা (এফআইপি) এর অংশ হিসেবে, সহজলভ্য ও নিরাপদ সঞ্চয় পণ্য তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। নতুন সঞ্চয়পত্রের নকশা বিশেষভাবে নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে লক্ষ্যবদ্ধ।

অর্থ মন্ত্রী শ্রীমতি রেহানা বেগমের মতে, 'সবার জন্য সঞ্চয়পত্র' দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তিনি উল্লেখ করেন, এই সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকার সরাসরি জনগণের হাতে সঞ্চয়ের সুযোগ এনে, মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবকে কমাতে সক্ষম হবে। প্রধান বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জানান, ব্যাংক শাখা ও ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্রের বিক্রয় সহজতর করা হবে এবং গ্রাহকদের জন্য স্বয়ংক্রিয় সুদ গণনা ও রসিদ প্রদান ব্যবস্থা চালু করা হবে। গ্রামীণ এলাকায় কৃষক সমিতি ও মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থা গুলোও এই পণ্যের প্রচার ও বিক্রয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক, বহু পরিবার ইতিমধ্যে প্রথম কিস্তি জমা দিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গড়ে তুলতে শুরু করেছে।

প্রয়োগের প্রথম ধাপ হিসেবে, সরকার আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশের সব ব্যাংক শাখা ও পোস্ট অফিসে সঞ্চয়পত্রের বিক্রয় শুরু করবে। পাশাপাশি, মোবাইল ব্যাংকিং ও ই-ওয়ালেট সেবা ব্যবহার করে অনলাইন আবেদন ও জমা গ্রহণের সুবিধা প্রদান করা হবে, যাতে দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলের নাগরিকরাও সহজে অংশ নিতে পারেন। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিভাগের তদারকি কমিটি নিয়মিতভাবে বিক্রয় পরিসংখ্যান ও গ্রাহক সন্তুষ্টি মূল্যায়ন করবে এবং প্রয়োজন অনুসারে সুদের হার বা মেয়াদে সমন্বয় আনবে। দীর্ঘমেয়াদে সরকার এই সঞ্চয়পত্রকে অন্যান্য আর্থিক পণ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে, জাতীয় সঞ্চয় নীতি গঠনে একটি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছে, যা দেশের মোট সঞ্চয় হারকে আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি নিয়ে যাবে।