বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ অর্থবছরে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর মোট জমা ৩৩.২ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে, যা পূর্ববছরের তুলনায় ১৮.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ঋণ প্রদানের পরিমাণ ২৯.৫ ট্রিলিয়ন টাকায় বৃদ্ধি পেয়ে দেশের মোট ব্যাংকিং সেক্টরের ২৪.৩ শতাংশ অংশ দখল করেছে। এই সূচকগুলো দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নীতি এবং শেয়ারহোল্ডারদের আয় বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংকিং সেবার দ্রুত সম্প্রসারণের প্রমাণস্বরূপ বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে রমজান ও ঈদ উত্সবের সময়কালে গ্রাহকসংখ্যা ও লেনদেনের পরিমাণে তীব্র উত্থান দেখা গিয়েছে, যা ব্যবসার তাত্ক্ষণিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

ইসলামী ব্যাংকিং সেক্টর ১৯৯১ সালে ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়নের পর থেকে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে, তবে ২০০০ দশকের শেষের দিকে সরকারী উদার নীতি ও শারিয়াহ ভিত্তিক আর্থিক পণ্যের বৈচিত্র্যায়নের প্রচেষ্টার ফলে গ্রাহকসংখ্যা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে দেশে মোট আটটি ইসলামী ব্যাংক এবং দশটি ইসলামী আর্থিক সংস্থা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, যাদের মধ্যে আল-ইসলামিক ব্যাংক, ইস্লামিক ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এবং সোনার ব্যাংক গ্রুপের ইসলামী শাখা প্রধান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো মুদ্দা, মুরাবাহা, ইজারা এবং সুকুক ইত্যাদি শারিয়াহ-অনুমোদিত পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে রিয়েল এস্টেট, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে মূলধন সরবরাহ করে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

অধিকাংশ ইসলামী ব্যাংকের সিইও এবং শাখা প্রধানরা ব্যবসা বৃদ্ধির পেছনে গ্রাহকদের শারিয়াহ-অনুমোদিত আর্থিক সেবার প্রতি বাড়তি আস্থা ও আন্তর্জাতিক ইসলামী আর্থিক বাজারের প্রবেশযোগ্যতা উল্লেখ করেছেন। আল-ইসলামিক ব্যাংকের সিইও মোহাম্মদ রশিদ বলেন, “শেয়ারহোল্ডারদের প্রত্যাশা পূরণে আমরা মুদ্দা-ভিত্তিক ঋণ পণ্যকে সহজলভ্য করে তুলেছি, ফলে গ্রাহকসংখ্যা ও জমা বৃদ্ধি পেয়েছে।” বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অফ ইস্লামিক ফাইন্যান্সের পরিচালক শফিকুল ইসলামও জানিয়েছেন, “নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে শক্তিশালী করে এবং শারিয়াহ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করে আমরা ব্যাংকগুলোর স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করেছি।” গ্রাহক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, রমজান মাসে মুদ্দা-ভিত্তিক গৃহঋণ ও ব্যবসা ঋণ গ্রহণের হার ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গৃহস্থালী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক খাতের নগদ প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ত্রৈমাসিকে ইসলামী ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য নতুন নির্দেশিকা প্রণয়ন করবে, যার মধ্যে শারিয়াহ তত্ত্বাবধানের জন্য স্বতন্ত্র তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা গঠন, ঝুঁকি মূল্যায়ন মডেল আপডেট এবং গ্রাহক সুরক্ষার জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বৃদ্ধি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া সরকার আর্থিক অন্তর্ভুক্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইসলামী ব্যাংকিংকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে, ভবিষ্যতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে সাশ্রয়ী হাউজিং ও কৃষি ঋণ প্রকল্প চালু করার পরিকল্পনা করেছে। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন, যদি এই নীতিগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদ ৪৫ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তি লক্ষ্যকে ত্বরান্বিত করবে।