গায়ে পা লাগলে ‘সালাম’ করা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিষ্টাচারের একটি প্রচলিত রীতি হিসেবে পরিচিত। বিয়ের অনুষ্ঠান, শোকসভা, অথবা কোনো সম্মানসূচক সমাবেশে প্রায়শই দেখা যায় যে, উপস্থিত ব্যক্তিরা গায়ে পা লাগলে হাত তুলিয়ে ‘সালাম’ জানায়। এই ভঙ্গি সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করার পাশাপাশি শিষ্টাচারিক শোভা যোগায় বলে স্থানীয় লোকসমাজে এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রথা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে; ইসলামে গায়ে পা লাগলে সালাম করার বা অনুরূপ শারীরিক ভঙ্গি গ্রহণের কোনো স্পষ্ট বিধান আছে কি না, তা নিয়ে ধর্মতত্ত্ববিদ ও সাধারণ মুসলিম উভয়েরই কৌতূহল।

ইসলামী শাস্ত্রের মধ্যে শারীরিক ভঙ্গি ও সালাম সম্পর্কিত বেশ কিছু হাদিস ও কীর্তি উল্লেখ করা হয়েছে, তবে গায়ে পা লাগলে সালাম করার বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায় না। হাদিসে মূলত হাতের মাধ্যমে সালাম জানানো, ‘আস-সালামু আলাইকুম’ বাক্যটি উচ্চারণ করা, এবং শারীরিক সংস্পর্শে অশালীনতা এড়িয়ে চলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে, প্রাচীন আরব সমাজে গায়ে পা লাগিয়ে সালাম করার কোনো রীতি ছিল না; বরং দুজনের মুখোমুখি হয়ে হাত মেলিয়ে সালাম আদানপ্রদান করা প্রচলিত ছিল। এই প্রেক্ষাপটে, দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিতে গায়ে পা লাগিয়ে সালাম করার রীতি সম্ভবত স্থানীয় রীতিনীতির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে উদ্ভূত হয়েছে, যা ধর্মীয় অনুশীলনের পরিবর্তে সামাজিক শিষ্টাচারের এক রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্থা ও আলেমদের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (সা.)র সরাসরি কোনো নির্দেশনা না থাকায়, অধিকাংশ উলেমা এটিকে ‘সালাম’র ঐতিহ্যিক রূপের অতিরিক্ত শোভা হিসেবে বিবেচনা করেন এবং কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন না। তাছাড়া, ইসলামিক ফিকহের প্রধান গ্রন্থে গায়ে পা লাগিয়ে সালাম করার কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, ফলে এটি অনুমোদনযোগ্য শিষ্টাচারিক কাজ হিসেবে দেখা যায়। তবে কিছু সংরক্ষণবাদী গোষ্ঠী এটিকে ‘বহিরাগত প্রথা’ বলে সমালোচনা করে এবং মুসলিম সমাজে শুদ্ধ ইসলামী আচরণ বজায় রাখতে এ ধরনের রীতি ত্যাগের আহ্বান জানায়। সাধারণ জনগণের মধ্যে এই বিতর্কের প্রতিক্রিয়া মিশ্র; কেউ এটি ঐতিহ্যবাহী শিষ্টাচার হিসেবে গ্রহণ করে, অন্যদিকে কিছু তরুণ প্রজন্ম আধুনিক ধর্মীয় জ্ঞান অনুসারে এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় শারীরিক ভঙ্গি বাদ দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করে।

সরকারি ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের দিক থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আইনগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি, তবে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলামী শিষ্টাচার সংক্রান্ত সেমিনার ও প্রশিক্ষণ কর্মশালার মাধ্যমে সঠিক সালাম পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ইসলামিক ফেডারেশন ও জাতীয় ধর্মীয় সংস্থা গুলো সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইসলামী শিষ্টাচার নির্দেশিকা’তে গায়ে পা লাগিয়ে সালাম করার পরিবর্তে হাতের মাধ্যমে সরাসরি সালাম জানানোকে উৎসাহিত করেছে। ভবিষ্যতে এই নির্দেশিকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও সরকারি দপ্তরে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হবে, যাতে সামাজিক রীতি ও ধর্মীয় নীতি সমন্বয়পূর্ণভাবে গড়ে ওঠে এবং জনগণের মধ্যে শুদ্ধ ইসলামী শিষ্টাচার প্রতিষ্ঠিত হয়।