গত সপ্তাহে ঢাকা শহরে অনুষ্ঠিত পরিবেশ সংক্রান্ত জাতীয় সেমিনারের কারিগরি অধিবেশনে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে উৎপাদনকারীদের দায়িত্ব গ্রহণের তাগিদকে কেন্দ্র করে ইপিআর নীতির বাস্তবায়ন বিষয়ক বিস্তৃত আলোচনা হয়। অধিবেশনে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, শিল্প সমিতির প্রতিনিধিরা এবং পরিবেশ সংস্থার বিশেষজ্ঞরা সমবেত হন। সেমিনারের মূল উদ্দেশ্য ছিল উৎপাদন শৃঙ্খলায় ইপিআর নীতি সংযোজনের প্রক্রিয়া ও চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করা এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। এই আলোচনার মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে উৎপাদনকারীদের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব স্পষ্ট করা হয়েছে। অধিবেশনের শেষে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে উৎপাদনকারীদের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং গ্রহণের বাধ্যতামূলক নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় এক কোটি টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার অধিকাংশই সঠিকভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ না হওয়ায় নদী, সমুদ্র এবং নগর পরিবেশে জমা হয়। ২০১৯ সালে সরকার প্রথমবারের মতো প্লাস্টিক ব্যাগের উপর কর আরোপের মাধ্যমে ব্যবহার কমাতে উদ্যোগ নেয়, তবে তা প্রত্যাশিত ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়। তদুপরি, ২০২১ সালে ইপিআর নীতির খসড়া প্রস্তুত করা হয়, যা উৎপাদনকারীদের পণ্য জীবনের শেষ পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব অর্পণ করে। যদিও নীতি প্রণয়নের পর বিভিন্ন শিল্প সমিতি থেকে সমর্থন পাওয়া গিয়েছে, তবু বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো ও তদারকি ব্যবস্থার অভাব এখনও বিদ্যমান। এই পটভূমিতে বর্তমান সেমিনারটি নীতি বাস্তবায়নের কার্যকরী রূপরেখা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সেমিনারে প্রকল্পের জাতীয় বিশেষজ্ঞ মাকসুদ সিনহা ইপিআর নীতির প্রযুক্তিগত দিক ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিশদ উপস্থাপনা দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে উৎপাদনকারীদের জন্য বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে এবং তা না মানলে কঠোর শাস্তি আরোপিত হবে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব রাহুল চৌধুরী উপস্থাপনা শেষে নীতি সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর সেশনে জোর দিয়ে বললেন, “দায়িত্বশীল উৎপাদনই টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।” শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল করিমও উল্লেখ করেন, “আমরা নীতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্বয়ংক্রিয় রিসাইক্লিং সিস্টেম স্থাপন করতে প্রস্তুত, তবে সরকার থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।” সাধারণ জনগণের মধ্যে এই উদ্যোগের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে; সামাজিক মিডিয়ায় বহু নাগরিক প্লাস্টিক ব্যবহার কমাতে এবং পুনর্ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করেছেন।
পরবর্তী সপ্তাহে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ইপিআর নীতির পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের কাজ দ্রুততর করার নির্দেশ জারি করেছে। আইন প্রণয়নের পাশাপাশি একটি ত্রৈমাসিক পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা হবে, যার সদস্য হিসেবে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, শিল্প প্রতিনিধিরা এবং স্বতন্ত্র পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই কমিটি নীতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন, সমস্যার সমাধান এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাবের দায়িত্ব পালন করবে। সরকার এছাড়াও ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি গ্রহণে অনুদান ও কর রেহাই প্রদান করার পরিকল্পনা করেছে, যা উৎপাদন খরচ কমিয়ে দায়িত্বশীল উৎপাদনকে উৎসাহিত করবে। দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য হল প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ২০৩০ সালের মধ্যে অর্ধেক কমিয়ে আনা এবং দেশের পরিবেশগত স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা।