কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী গ্রামে দুর্গাপূজার প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে ঢাকের চাহিদা মেটাতে ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকের হাট’ পুনরায় বসে উঠেছে। এই বছর পঞ্চম তিথি থেকে দশম তিথি পর্যন্ত চলমান পূজার ধারায় হাটটি সকাল আটটায় খুলে গৃহস্থ ও পেশাদার ঢাকবাদকদের জন্য বিক্রয় ও চুক্তি স্থাপনের স্থান হয়ে ওঠে। হাটের প্রাঙ্গণে বিভিন্ন ধরণের ঢাক, পাণ্ডা, তবলা ও সঙ্গীত সরঞ্জাম সাজানো রয়েছে এবং বিশাল ভিড়ের আগমন প্রত্যক্ষ করা যায়। স্থানীয় মিডিয়া ও নাগরিকদের দৃষ্টিতে এই আয়োজনকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

‘ঢাকের হাট’ কিশোরগঞ্জের ইতিহাসে চার শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। প্রথমবারের মতো ১৭শ শতকে এই অঞ্চলে ঢাকের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বণিক ও শিল্পীরা একত্রিত হয়ে একটি স্থায়ী বাজার গঠন করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাটটি কেবল ঢাকের বিক্রয়ই নয়, ঢাকের নির্মাণ, মেরামত ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও বিকশিত হয়। অতীতের রেকর্ডে দেখা যায়, বহু বিশিষ্ট ঢাকবাদক এই হাটের মাধ্যমে তাদের যন্ত্র সংগ্রহ করে দেশ-বিদেশে সাফল্য অর্জন করেছেন। এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী বাজারের অবসান না ঘটার জন্য স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ পরিষদ নিয়মিতভাবে ঐতিহাসিক নথি সংগ্রহ ও প্রকাশ করে আসছে।

হাটের আয়োজক কটিয়াদী মন্দির কমিটি সভাপতি শ্রীমতি রেহানা জানান, “দুর্গাপূজার মণ্ডপে সঠিক সুর ও তাল বজায় রাখতে উচ্চমানের ঢাকের প্রয়োজন, তাই এই হাটের মাধ্যমে সরাসরি সরবরাহকারী ও শিল্পীদের সঙ্গে চুক্তি করা সহজ হয়।” স্থানীয় ঢাকবাদক রাহুল চৌধুরী যোগ করেন, “এই হাটের মাধ্যমে আমি আমার যন্ত্রের মান যাচাই করে সাশ্রয়ী দামে ক্রয় করতে পারি, যা মণ্ডপের বাজনায় গুণগত উন্নতি আনে।” গ্রামবাসী ও ভ্রমণকারীও হাটের বৈচিত্র্য ও সুলভ মূল্যের প্রশংসা করে, এ ধরনের আয়োজনের ধারাবিকতা কামনা করেন।

স্থানীয় প্রশাসন হাটের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অস্থায়ী অনুমোদন পত্র জারি করেছে এবং বিক্রেতা-ক্রেতার মধ্যে চুক্তি রেকর্ড করার জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করেছে। কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদ সংস্কৃতি বিভাগ হাটের ঐতিহাসিক দিক সংরক্ষণে বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করে, ভবিষ্যতে হাটকে একটি সাংস্কৃতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এছাড়া, জাতীয় সংস্কৃতি অধিদপ্তরকে অনুরোধ করা হয়েছে হাটের ঐতিহ্যবাহী দিককে ‘অমূর্ত সাংস্কৃতিক সম্পদ’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করতে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ঐতিহ্য সুরক্ষিত থাকে।