গ্রীষ্মের শেষের দিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিক বৃষ্টিপাতের পর, সরকার আজ ঢাকা শহরের জাতীয় সম্মেলন হলের প্রধান মঞ্চে 'বৃষ্টির সঞ্চয়, ভবিষ্যৎ সুরক্ষা' শিরোনামে একটি জাতীয় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ উদ্যোগের সূচনা ঘোষণা করেছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হল বৃষ্টির পানি সঠিকভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহার করে কৃষি, শিল্প ও গৃহস্থালী ক্ষেত্রে জলসঙ্কটের ঝুঁকি কমানো। সরকারী সূত্র অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ১০,০০০ টির বেশি বৃষ্টির সঞ্চয় পদ্ধতি স্থাপন করা হবে, যার মাধ্যমে বার্ষিক প্রায় ১.৫ কোটি ঘনমিটার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গৃহীত এই পরিকল্পনা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় দেশের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বিবেচিত।

গত দশকে বাংলাদেশে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে নগর ও গ্রামীণ এলাকায় বৃষ্টির পানি সঠিকভাবে ব্যবহার না করার ফলে বড় অংশে হারিয়ে যায়। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো বন্যা প্রবণ শহরে বৃষ্টির পানি দ্রুত প্রবাহিত হয়ে নিকাশি ব্যবস্থার অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, ফলে বন্যা ও জলের ঘাটতির দ্বৈত সমস্যা দেখা দেয়। পূর্বে ২০১৯ সালে চালু করা 'বৃষ্টির পানি ব্যবহার' pilot প্রকল্পে সীমিত সফলতা সত্ত্বেও, সমন্বিত নীতি ও আর্থিক সহায়তার অভাবে তা বিস্তৃত করা সম্ভব হয়নি। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা, শস্য উৎপাদনের চাহিদা এবং নগরায়নের দ্রুতগতি একসাথে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব শ্রীমতি রেহানা বললেন, 'বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ কেবল পরিবেশ রক্ষার নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও মূল চাবিকাঠি'। কৃষক সমিতির সভাপতি মো. হাবিবুর রহমান জানান, 'যদি সঠিকভাবে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করা যায়, তবে শস্যের ফলন বাড়বে এবং খরচ কমবে'। এছাড়া, জাতীয় জল সংরক্ষণ সংস্থার গবেষক ড. নূরুল হক উল্লেখ করেন, 'প্রযুক্তিগত দিক থেকে রেইন গ্যাদারিং সিস্টেম, ট্যাঙ্ক ও ভূগর্ভস্থ সঞ্চয় পদ্ধতি আমাদের জন্য সর্বোত্তম'। সাধারণ জনগণের মধ্যে এই উদ্যোগের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে; সামাজিক মাধ্যমের মন্তব্যে বহু নাগরিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে বাড়িতে ট্যাঙ্ক স্থাপনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্কতা প্রকাশ করেছেন যে, নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ তদারকি ও আর্থিক সহায়তা অপরিহার্য।

সরকার ইতিমধ্যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য ৫ বিলিয়ন টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে অগ্রগতি রিপোর্ট জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে। স্থানীয় সরকারগুলোকে নগর ও গ্রামীণ এলাকায় রেইন গ্যাদারিং সিস্টেম স্থাপনের জন্য ট্যাক্স ছাড় ও সহজতর অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রদান করা হবে। পাশাপাশি, জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক সঞ্চয় প্রযুক্তি বিকাশে গবেষণা তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছে। আগামী বছর থেকে এই নীতি অনুযায়ী সব সরকারি ভবন, স্কুল ও হাসপাতালকে বৃষ্টির পানি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে, এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেল চালু করা হবে। দীর্ঘমেয়াদে এই সমন্বিত পদক্ষেপগুলো দেশের জল নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে এবং বন্যা ঝুঁকি কমিয়ে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করবে।