সকালের প্রথম আলোতে ঘুম থেকে উঠতে না পারা বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি সাধারণ সমস্যা হিসেবে রূপ নেয়। বিশেষত কর্মদিবসের শুরুতে সময়মতো শয্যা ত্যাগ না করা কর্মক্ষমতা হ্রাস, কর্মস্থলে দেরি এবং স্বাস্থ্যগত সমস্যার দিকে ধাবিত হতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ত্রিশ শতাংশই ঘুমের অস্বাভাবিকতা ও শোয়ার সময়ের পরিবর্তনের কারণে সকালবেলা জাগতে অসুবিধা বোধ করেন। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করে না, বরং পরিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক কার্যক্রমের সুষ্ঠু পরিচালনায়ও বাধা সৃষ্টি করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, ঘুমের গুণগত মানের অবনতি, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ এবং অনিয়মিত শোয়ার সময়সূচি এই সমস্যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সময়মতো শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি নিতে বাধা সৃষ্টি হয়।

মানবদেহের জৈবঘড়ি, যা সেরিয়াল গ্যাংগ্লিয়ার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, প্রাকৃতিক আলোর পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঘুম-জাগরণ চক্র নির্ধারণ করে। সূর্যোদয়ের প্রথম রশ্মি রেটিনায় পৌঁছালে মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমে যায় এবং শরীর স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাগ্রত হয়। তবে আধুনিক জীবনের দ্রুতগতির রুটিন, রাতের দেরি পর্যন্ত কাজ করা, স্ক্রিনের নীল আলো এবং অনিয়মিত খাবারের সময়সূচি এই স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করে। গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে যে, রাতের আট ঘণ্টার পর ঘুমিয়ে পড়া এবং সকাল আটটায় জাগা রুটিন বজায় রাখলে জৈবঘড়ি স্বাভাবিকভাবে কাজ করে, ফলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে।

বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্নায়ুবিজ্ঞানী এই বিষয়টি নিয়ে একমত যে, ঘুমের সময়সূচি পরিবর্তনের জন্য কিছু সহজ অভ্যাস গ্রহণ করা প্রয়োজন। ড. রাহিম উদ্দিন, নিউরোফিজিওলজি বিভাগের প্রধান, উল্লেখ করেন, “প্রতিদিন একই সময়ে শোয়া ও জাগা, শোয়ার আগে কম্পিউটার ও মোবাইল স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা, এবং হালকা শারীরিক ব্যায়াম করা জৈবঘড়ি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।” তদুপরি, পুষ্টিবিদ শ্রীমতি সুমাইয়া চৌধুরী যোগ করেন, “সকালের সূর্যালোকে পাঁচ মিনিটের বাইরে দাঁড়িয়ে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন মস্তিষ্ককে সতেজ করে এবং ঘুমের গুণগত মান বাড়ায়।” এই ধরনের অভ্যাসের ফলে কর্মস্থলে সময়মতো উপস্থিতি, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ঘুম গবেষণা কেন্দ্রের সমন্বয়ে গৃহীত নতুন নীতি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে “সকাল জাগরণ সচেতনতা” শিরোনামে একটি জাতীয় প্রচারাভিযান চালু করা হবে। এই অভিযানে টেলিভিশন, রেডিও এবং সামাজিক মাধ্যমে ঘুমের সঠিক রুটিন সম্পর্কে তথ্য প্রদান, কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নমনীয় সময়সূচি প্রয়োগ এবং স্কুলে “সকাল ব্যায়াম ক্লাব” গঠন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি, সরকারি হাসপাতালগুলোতে ঘুমের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিশেষ পরামর্শকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। ভবিষ্যতে, জৈবঘড়ি গবেষণায় অগ্রগতি ঘটিয়ে ব্যক্তিগত ঘুমের রুটিনকে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এভাবে, ঘুমের গুণগত মান উন্নত করে জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও জনস্বাস্থ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।