যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউসের ‘ফ্রি ডম অন দ্য নেট ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ইন্টারনেট স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। র্যাঙ্কিংয়ে দেশের অবস্থান পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় দুই ধাপ উপরে উঠে এসেছে এবং এশিয়ার মধ্যে শীর্ষ পাঁচের মধ্যে স্থান পেয়েছে। তবে একই প্রতিবেদনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, বিশেষত অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ওপর বাড়তি নিয়ন্ত্রণ এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রয়োগের প্রভাবকে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইন্টারনেট স্বাধীনতা একটি গ্লোবাল সূচক, যার মূল্যায়নে নেট সংযোগের বিস্তৃতি, তথ্যের প্রবেশাধিকার, সাইবার নিরাপত্তা, এবং সরকারী হস্তক্ষেপের মাত্রা বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে গত দশকে মোবাইল ব্রডব্যান্ডের দ্রুত বিস্তার, ডিজিটাল সেবা ও ই-গভর্ন্যান্সের উন্নয়ন এই সূচকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে ২০২১ সালে গৃহীত সাইবার নিরাপত্তা আইন, অনলাইন প্রকাশনা নিয়ন্ত্রণের বিধান এবং মিডিয়া সেবা প্রদানকারীর লাইসেন্স শর্তাবলী পূর্বে উল্লেখযোগ্য সমালোচনার বিষয় ছিল। এই পটভূমিতে ফ্রিডম হাউসের নতুন র্যাঙ্কিং দেশের নীতি সংস্কারের ফলাফলকে স্বীকৃতি দেয়, তবে একই সঙ্গে মিডিয়া স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অবশিষ্ট কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
ফ্রিডম হাউসের বিশ্লেষক দল বাংলাদেশের ইন্টারনেট অবকাঠামোর উন্নয়নকে প্রশংসা করে, তবে তারা স্থানীয় সিভিল সোসাইটি সংগঠন ও সাংবাদিক সমিতির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছে যে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধি বলেন, তথ্যের স্বচ্ছতা ও নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্য আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। সাধারণ জনগণের মধ্যেও এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার উত্থান দেখা গেছে; সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা সরকারী নীতির ইতিবাচক দিকের প্রশংসা করার পাশাপাশি তথ্যের স্বাধীন প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
সরকার বর্তমানে ইন্টারনেট অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় নতুন নীতি খসড়া প্রণয়ন করছে, যার লক্ষ্য অনলাইন প্রকাশনা নিয়ন্ত্রণের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং প্রকাশকের অধিকার সুরক্ষিত করা। পাশাপাশি, স্বাধীন মিডিয়া সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে স্বেচ্ছাসেবী তত্ত্বাবধান কমিটি গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বাড়াবে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই সংস্কারগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ইন্টারনেট স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক নেতা হিসেবে তার অবস্থান আরও দৃঢ় করতে পারবে, তবে তা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আইনগত কাঠামোর পুনর্বিবেচনা অপরিহার্য।