খুলনার প্রধান বাজারে অবস্থিত ইন্দ্রমোহন সুইটস, ১৮৯০ সাল থেকে একই রেসিপিতে পাঁচ ধরনের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি উৎপাদন করে আসছে। ১৩৬ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে এই মিষ্টিগুলি শুধু স্বাদে নয়, সংস্কৃতিতে ও সামাজিক বন্ধনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। আজও প্রতিদিন শত শত গ্রাহক এই মিষ্টির স্বাদে মুগ্ধ হয়ে দোকানে আসেন, যা স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির উৎপাদন প্রক্রিয়া ও স্বাদ বজায় রাখার জন্য মালিকরা কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, যা স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রশংসিত হচ্ছে।

ইন্দ্রমোহন সুইটসের প্রতিষ্ঠা হয় ১৮৮৯ সালে, যখন প্রতিষ্ঠাতা শ্রী হরিরাম চৌধুরী এই ব্যবসা শুরু করেন। তখনের বাজারে মিষ্টি বিক্রির চাহিদা বাড়ছিল, এবং তিনি নিজস্ব গোপন রেসিপি ব্যবহার করে পাঁচটি মিষ্টি—রসগোল্লা, সন্দেশ, পায়েস, লাড্ডু ও চমচম—উৎপাদন করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মিষ্টিগুলি খুলনার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, বিশেষ করে উৎসব, বিবাহ ও সামাজিক সমাবেশে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে রেসিপি হস্তান্তরিত হওয়ায় স্বাদে কোনো পরিবর্তন না ঘটিয়ে আজ পর্যন্ত একই মান বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।

মালিক শ্রী রামকৃষ্ণ চৌধুরী জানান, রেসিপির গোপনীয়তা ও গুণমান বজায় রাখতে কাঁচামাল নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রস্তুত প্রণালী পর্যন্ত সবকিছুই হাতে করা হয়। স্থানীয় গ্রাহকরা বলেন, ইন্দ্রমোহন সুইটসের মিষ্টি তাদের শৈশবের স্মৃতি, এবং কোনো উৎসবের আনন্দে এই মিষ্টি ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। ইতিহাসবিদ ড. সুমন দাশও উল্লেখ করেন, এই মিষ্টিগুলি খুলনার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা শহরের পরিচয় গড়ে তুলতে সহায়তা করে। ফলে, মিষ্টির জনপ্রিয়তা কেবল স্বাদে নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যেও প্রতিফলিত হয়।

সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ইন্দ্রমোহন সুইটসকে অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাবনা প্রস্তুত করেছে। ভবিষ্যতে এই মিষ্টিগুলিকে জাতীয় পর্যায়ে সুরক্ষিত করার জন্য বিশেষ নীতি গৃহীত হবে, যাতে রেসিপি ও উৎপাদন প্রক্রিয়া সংরক্ষিত থাকে। এছাড়া, স্থানীয় সরকারও এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাকে সমর্থন জানিয়ে আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করবে, যাতে তরুণ প্রজন্মও এই শিল্পে আগ্রহী হয় এবং ঐতিহ্য বজায় রাখতে পারে।