ঢাকা ও গাজীপুরে গতকাল সন্ধ্যায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভে সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত কাজের সময়সীমা নিয়ে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। রেলওয়ে স্টেশন, বাণিজ্যিক এলাকা ও কারখানা সমবেত হয়ে প্রতিবাদে অংশ নেয়। পুলিশ ও রাইডার গার্ডের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয় এবং সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভ পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক আহ্বান করেন। বৈঠকে শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রধান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য গার্মেন্টস খাতের শান্তি অপরিহার্য এবং দ্রুত সমাধান না হলে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান দু'ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিক্ষোভের পটভূমি বহু বছর ধরে চলমান বেতন ও কাজের শর্তাবলীর অমিলের ফল। গত বছর গার্মেন্টস শিল্পে মুদ্রাস্ফীতি ও রপ্তানি হ্রাসের ফলে শ্রমিকদের বাস্তব বেতন হ্রাস পেয়েছে, যা কর্মী ইউনিয়নগুলোকে পুনরায় দরখাস্ত করতে বাধ্য করেছে। পূর্বে ২০২২ সালে একই রকম বিক্ষোভে সরকার মজুরি বৃদ্ধি ও কাজের সময়সীমা সীমাবদ্ধ করার নীতি প্রণয়ন করেছিল, তবে বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় সমস্যার সমাধান হয়নি। এছাড়া, গার্মেন্টস সেক্টরে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীলতা ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের চাহিদা বাড়ার ফলে উৎপাদন বাড়াতে অতিরিক্ত শিফট চালু করা হয়েছে, যা শ্রমিকদের ক্লান্তি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোই আজকের বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রধান শ্রীমতি রেহানা বেগম বিক্ষোভের মূল দাবিগুলোকে স্বীকৃতি দিয়ে দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার তৎক্ষণাৎ বেতন সমন্বয় পরিকল্পনা তৈরি করবে এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দ করবে। অপরদিকে, গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা, যাদের নাম প্রকাশ না করে, বৈঠকে উপস্থিত না হওয়ায় তাদের পক্ষ থেকে কোনো সরাসরি মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে তারা সামাজিক মাধ্যমে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মুখপাত্র ক্যাপ্টেন রাহুল আহমেদ জানান, বিক্ষোভে যুক্ত হওয়া কিছু রাজনৈতিক সংগঠনের নেতার উপস্থিতি তদন্তের আওতায় রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ জনগণের মধ্যে এই বিক্ষোভ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়; কিছু মানুষ শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার পক্ষে সাড়া দেয়, আবার অন্যরা অর্থনৈতিক ক্ষতি ও সামাজিক অশান্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

বৈঠকের পরপরই সরকার তৎক্ষণাৎ কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পুলিশ ও রাইডার গার্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, বিক্ষোভের সময় ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তি পুনরুদ্ধার এবং আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা সেবা দ্রুত প্রদান করা হবে। পাশাপাশি, শ্রম মন্ত্রণালয় গার্মেন্টস কারখানাগুলোর ওপর তদারকি বাড়াবে এবং কাজের সময়সীমা, অতিরিক্ত শিফট ও নিরাপত্তা মানদণ্ডের অনুসরণ নিশ্চিত করতে র‌্যান্ডম চেক চালু করবে। সরকার আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন সমন্বয় ও নিরাপত্তা উন্নয়ন পরিকল্পনা উপস্থাপন করবে, যা সংসদে আলোচনার জন্য পাঠানো হবে। দীর্ঘমেয়াদে গার্মেন্টস শিল্পের প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে শ্রমিকদের কল্যাণ ও উৎপাদনশীলতা দু'ই সমন্বিত করে নীতি গঠন করা হবে, এটাই সরকারের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি।