ফ্রান্সের প্যারিসে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী রশিদুল হক (৩৪) তার গ্যাঁরেজে অবস্থিত পোশাক ও গহনার দোকানে গত রাত্রি অন্ধকারে বিশাল ভাঙচুর-লুটপাটের শিকার হন। স্থানীয় পুলিশ জানায়, অপরাধীরা রাত দশটায় প্রবেশ করে, দোকানের জানালা ভেঙে, সুরক্ষার ক্যামেরা নষ্ট করে এবং প্রায় নব্বই হাজার ইউরো মূল্যের পণ্য—যার মধ্যে সোনার গহনা, ডিজাইনার পোশাক এবং ইলেকট্রনিক সামগ্রী অন্তর্ভুক্ত—সম্পূর্ণ লুট করে নিয়ে যায়। এই ঘটনা শুধুমাত্র একক ব্যবসায়ীর ক্ষতি নয়, প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর আঘাত হানার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। পুলিশের মতে, এই ধরনের সন্ত্রাসী নকশা না থাকলেও, অপরাধের পেছনে সংগঠিত চোরাচালান গোষ্ঠীর জড়িত থাকার সন্দেহ রয়েছে। স্থানীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক মাসে ইউরোপীয় শহরে বিদেশি ব্যবসায়ীদের লক্ষ্যবস্তু করে এমন লুটপাটের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সংখ্যা প্রায় এক লাখেরও বেশি, যারা রেস্টুরেন্ট, মুদি দোকান, গয়না ও পোশাক ব্যবসা সহ নানা ক্ষেত্রে সক্রিয়। গত বছরই প্যারিসের আরেকটি বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে একই রকম লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে প্রায় পঁচিশ হাজার ইউরো মূল্যের পণ্য হারিয়ে গিয়েছিল। এই ধরনের অপরাধের পেছনে প্রায়শই স্থানীয় গ্যাং ও আন্তর্জাতিক চোরাচালান নেটওয়ার্কের সমন্বয় থাকে, যা উচ্চমূল্যের পণ্যকে দ্রুত বিক্রয়ের জন্য গোপন চ্যানেলে পাঠায়। প্রবাসী ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব, অপর্যাপ্ত গার্ড ও পর্যাপ্ত আলোকসজ্জার ঘাটতি ইত্যাদি সমস্যাকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন। সরকারী দপ্তরগুলোও প্রবাসী সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপত্তা সচেতনতা প্রশিক্ষণ ও সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

লুটপাটের পর রশিদুল হক স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে অভিযোগ জানান, তিনি উল্লেখ করেন যে তার দোকানে সঞ্চিত সোনার গহনা ও ডিজাইনার পোশাকের মোট মূল্য প্রায় নব্বই হাজার ইউরো, যা সম্পূর্ণ লুট হয়ে গেছে। তিনি দাবি করেন, ক্ষতিপূরণ ও দ্রুত তদন্তের জন্য সরকারী সহায়তা দরকার। ফ্রান্সের স্থানীয় পুলিশ প্রধানও ঘটনাটিকে “গুরুতর সম্পত্তি অপরাধ” হিসেবে চিহ্নিত করে, তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, সাক্ষী বিবৃতি ও ডিএনএ বিশ্লেষণকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের কনসুলার কর্মকর্তা রেহানা বেগম জানান, তারা ভুক্তভোগীর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করবে এবং প্রবাসী সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতি এই ঘটনার পর সকল সদস্যকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে এবং সমষ্টিগতভাবে নিরাপত্তা ক্যামেরা ও গার্ড নিয়োগে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে।

ফরাসি পুলিশ এখনো অপরাধীদের সনাক্তকরণে অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি, তবে তারা লুটপাটের সময় ব্যবহৃত যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও সিসিটিভি রেকর্ড থেকে সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের তালিকা তৈরি করেছে। এছাড়া, ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রবাসী ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা গাইডলাইন প্রকাশের পরিকল্পনা করেছে, যার মধ্যে উচ্চমূল্যের পণ্য সংরক্ষণের জন্য সুরক্ষিত ভল্ট, অ্যালার্ম সিস্টেম ও নিয়মিত গার্ড প্যাট্রোল অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বাংলাদেশ দূতাবাসও প্রবাসী ব্যবসায়ীদের জন্য জরুরি হটলাইন চালু করেছে, যাতে তারা দ্রুত সহায়তা পেতে পারে। ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধ রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়িয়ে, ইউরোপীয় নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে তথ্য শেয়ারিং ও যৌথ অপারেশন চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।