দীর্ঘ দুই বছরের বিরতি পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে আবারও জীবন্ত হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচের উৎসব। গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তিতাসের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার জুড়ে চলেছে এই আনন্দময় প্রতিযোগিতা, যাতে অংশ নিয়েছে জেলার বিভিন্ন উপজেলার শত শত নৌকা। নদীর দুই তীরে জড়ো হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ, যারা নৌকাগুলোকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোরে জোরে গান গাইছেন এবং তালি দিচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে মনে হয়, যেন সময়ের পিছিয়ে পড়া ঐতিহ্য আবারও তার আসল রূপ ধারণ করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, করোনা মহামারির কারণে গত দুই বছর ধরে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব অনুষ্ঠিত হতে পারেনি, ফলে মানুষের মধ্যে ছিল অসম্পূর্ণতার অনুভূতি। এবারের উৎসব সেই অনুভূতি দূর করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আনন্দের সঞ্চার করেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার তিতাস নদী নৌকাবাইচের জন্য দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত। এখানকার নৌকাবাইচ শুধুমাত্র একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব, যা স্থানীয় মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঐতিহাসিকভাবে, এই নদীতে নৌকাবাইচের ঐতিহ্য শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। প্রতি বছর শীতকালে, বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের পর, তিতাস নদীতে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। নৌকাগুলো সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ জনের দল নিয়ে গঠিত হয়, যারা একসাথে পালার চলাচল করে নৌকাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই প্রতিযোগিতায় জয়ী দলকে পুরস্কার দেওয়া হয়, তবে আসল লক্ষ্য হলো দলের মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতা বজায় রাখা। স্থানীয় ঐতিহাসিকদের মতে, এই উৎসব স্থানীয় অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উৎসবের দিনে তিতাস নদীর দুই তীরে ছিল আনন্দের উৎসব। স্থানীয় বাসিন্দারা, শিক্ষার্থীরা এবং পর্যটকরা নদীর তীরে জড়ো হয়ে নৌকাগুলোকে উৎসাহিত করছিলেন। নৌকার দলগুলো বিভিন্ন রঙিন পোশাক পরে এবং গান গাইয়ে নৌকাবাইচের আনন্দ দ্বিগুণ করে তুলছিল। স্থানীয় একজন বাসিন্দা জানান, গত দুই বছর ধরে এই উৎসব অনুষ্ঠিত না হওয়ায় মানুষের মধ্যে ছিল এক ধরনের শূন্যতা। এবারের উৎসব সেই শূন্যতা পূরণ করেছে এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে আনন্দের সঞ্চার করেছে। নৌকাবাইচের প্রতিযোগিতা শেষে স্থানীয় প্রশাসন ও সংগঠনগুলো জয়ী দলগুলোকে পুরস্কার প্রদান করে। এছাড়াও, উৎসবের দিনে স্থানীয় বাজারে ও দোকানপাটে ছিল ব্যাপক ভিড়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষ এই উৎসবের সফল আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে উৎসবের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়। উৎসবের দিনে নদীর দুই তীরে পর্যাপ্ত পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের দল মোতায়েন করা হয়, যাতে কোনো দুর্ঘটনা বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এই উৎসবকে আরও আন্তর্জাতিক মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর জন্য নৌকাবাইচের নিয়মকানুন আরও কঠোর করা হবে এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনা উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এই উৎসবের মাধ্যমে তাদের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে আগ্রহী। কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপ স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।