প্রিন্ট ও ডাউনলোড সংস্করণ সুন্দর A4 প্রিন্ট, PDF এবং HD JPG
← ফিরে যান
PDF ডাউনলোড চাপলে Print Destination থেকে Save as PDF নির্বাচন করুন।
Ekushey Television
Ekushey Television
Ekushey Television QR Code
মতামত

প্রাচ্যবাদ: অন্যকে সংজ্ঞায়িত করার রাজনীতি ও জ্ঞান-ক্ষমতার সম্পর্ক

এডওয়ার্ড সাঈদের ‘প্রাচ্যবাদ’ তত্ত্ব আধুনিক চিন্তাধারায় এক অনন্য ও বিতর্কিত মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত। এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো, পশ্চিমা সমাজ কীভাবে প্রাচ্যকে ন
প্রতিবেদক: EKUSHEY TELEVISION LTD. প্রকাশ: Oct 20, 2026 প্রিন্ট: 20 Oct 2026, 09:27 AM
প্রাচ্যবাদ: অন্যকে সংজ্ঞায়িত করার রাজনীতি ও জ্ঞান-ক্ষমতার সম্পর্ক

এডওয়ার্ড সাঈদের ‘প্রাচ্যবাদ’ তত্ত্ব আধুনিক চিন্তাধারায় এক অনন্য ও বিতর্কিত মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত। এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো, পশ্চিমা সমাজ কীভাবে প্রাচ্যকে নিয়ে একটি বায়াসড বা পক্ষপাতদুষ্ট ধারণা তৈরি করে এবং সেই ধারণাকে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করে। সাঈদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রাচ্য কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, বরং এটি পশ্চিমের নিজস্ব পরিচয় গঠনের একটি আয়না। পশ্চিম প্রাচ্যকে ‘অজ্ঞ’, ‘প্রাথমিক’ এবং ‘বিভিন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করে নিজেকে ‘বুদ্ধিমান’, ‘উন্নত’ ও ‘সম্পন্ন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই দ্বৈত চিত্র তৈরির মাধ্যমে পশ্চিমা সমাজ প্রাচ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও শাসনের যৌক্তিকতা প্রদান করে। তাই এই তত্ত্ব কেবল একটি সাংস্কৃতিক আলোচনা নয়, বরং এটি ক্ষমতার রাজনীতি এবং জ্ঞানের ব্যবহার নিয়ে একটি গভীর সমালোচনা।

এই তত্ত্বের নেপথ্যে রয়েছে ঔপনিবেশিক যুগের দীর্ঘ ইতিহাস। ঔপনিবেশিক শাসনকালে পশ্চিমা শক্তির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রাচ্যের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে বন্দি করা। এই প্রক্রিয়ায় জ্ঞানকাঠামোকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সাঈদ তত্ত্বে জ্ঞানকাঠামোর এবং অভিজ্ঞতার সঠিক ব্যবহার ও বিশ্লেষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি দেখান যে, জ্ঞান কখনোই নিরপেক্ষ নয়; বরং এটি ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত। যখন পশ্চিম প্রাচ্যকে নিয়ে গবেষণা বা লেখালেখি করে, তখন তা প্রাচ্যের প্রকৃত অবস্থা প্রতিফলিত করে না, বরং পশ্চিমের নিজস্ব চাহিদা ও রাজনৈতিক স্বার্থকে পূরণ করে। এই জ্ঞান-উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় প্রাচ্যের নিজস্ব কণ্ঠস্বর নীরব করা হয় এবং তাদের অভিজ্ঞতা পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে পুনর্গঠিত হয়।

সংশ্লিষ্ট চিন্তাবিদ ও সমালোচকদের মতে, সাঈদের এই তত্ত্ব আধুনিক বিশ্বের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক গতিপ্রবাহে গভীর প্রভাব ফেলেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই তত্ত্ব আমাদের সচেতন করে তোলে যে, আমরা যে তথ্য বা ধারণা গ্রহণ করি, তা প্রকৃতপক্ষে কে তৈরি করেছে এবং তার পেছনে কী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। জনজীবনে এর প্রভাব অনুভূত হয় তখন, যখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাচ্যের দেশগুলোকে নিয়ে প্রতিবেদন বা পাঠ্যদান করে। সাঈদের দৃষ্টিতে, এই ধরনের চিত্রায়ন প্রাচ্যের মানুষের প্রতি একটি মানসিক বৈষম্য তৈরি করে, যা সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। তাই জ্ঞানকে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে এবং বহু-দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সত্যের খোঁজ করতে হবে।

কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষাবিদদের বর্তমান পদক্ষেপে এই তত্ত্বের আলোকে পাঠ্যক্রম ও গবেষণার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপটে, জ্ঞান-উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। প্রাচ্যের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠস্বরকে সম্মান ও গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যাতে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে একটি নিরপেক্ষ ও সঠিক চিত্র তৈরি করা যায়। সাঈদের তত্ত্ব আমাদের সতর্ক করে দেয় যে, জ্ঞান ও ক্ষমতার সম্পর্ক কতটা জটিল হতে পারে। তাই একটি ন্যায্য ও সমন্বিত বিশ্বব্যাপী সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য আমাদের জ্ঞানকাঠামোকে পক্ষপাতমুক্ত করতে হবে এবং অন্যকে সংজ্ঞায়িত করার রাজনীতি থেকে মুক্তি পেতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় আত্ম-পরীক্ষা ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণই হবে প্রধান হাতিয়ার।

© 2026 ekusheytelevision. All rights reserved.