ইউরোপের বহু দেশে গত সপ্তাহে বিশাল জনবিক্ষোভের ঢেউ দেখা গিয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন ও গ্রিসসহ বিভিন্ন দেশের রাস্তায় হাজারো নাগরিক সমবেত হয়ে জ্বালানির দাম, বিদ্যুৎ বিল এবং মৌলিক পণ্যের মূল্যের ধারাবিক বৃদ্ধির বিরোধিতা করছেন। বিশেষ করে তরুণ শিক্ষার্থী, কর্মী ও গৃহিণীরা মাইক হাতে নিলেন, সরকারকে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানালেন। বিক্ষোভের মঞ্চে সড়ক বন্ধ, ট্র্যাফিক জ্যাম এবং জনসাধারণের সেবা ব্যাহত হওয়া স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছে, যা দেশের সামাজিক শৃঙ্খলাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
এই প্রতিবাদগুলোর পেছনে রয়েছে কয়েক বছর ধরে গৃহীত অর্থনৈতিক নীতি ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি অনুসারে জ্বালানির কর বৃদ্ধি, পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের খরচ এবং কোভিড‑১৯ মহামারীর পর পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা সবই মূল্যস্ফীতির ত্বরান্বিত কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তদুপরি, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের ফলে গ্যাস ও তেল সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানির দাম অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়েছে। এই সব উপাদান মিলিয়ে গৃহস্থালীর ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো দৈনন্দিন জীবনে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর মুখে একসঙ্গে একই সুর শোনা যায়। ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি রাহুল হক বলেন, “শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য আমাদেরকে এমন উচ্চ মূল্যের সঙ্গে বেঁচে থাকতে হবে না।” শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা সরকারকে জ্বালানি কর হ্রাস, সরাসরি নগদ সহায়তা এবং মূল্যের নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। অর্থনীতিবিদ ড. সুমাইয়া চৌধুরী উল্লেখ করেন, “যদি তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ভোক্তা ব্যয় হ্রাস পাবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যাবে।” সাধারণ নাগরিকদের কথায় দেখা যায়, বাড়ির ভাড়া, গ্যাসের বিল এবং খাবারের দাম বাড়ার ফলে পরিবারিক বাজেটের ভার বাড়ছে, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে।
প্রতিটি দেশের সরকারই এখনো বিভিন্ন সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের অফিস জ্বালানি করের অস্থায়ী হ্রাস এবং নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা ঘোষণা করেছে। জার্মানিতে সরকার তেল ও গ্যাসের রপ্তানি কর কমিয়ে সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা চালু করেছে, পাশাপাশি ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার সমন্বয় করার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। তবে প্রতিবাদকারীরা দাবি করছেন, এই পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট নয় এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে জ্বালানি নীতি পুনর্বিবেচনা, সামাজিক নিরাপত্তা জাল বৃদ্ধি এবং ন্যায্য মূল্যের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যদি সরকার দ্রুত ও সমন্বিত নীতি গ্রহণ না করে, তবে ইউরোপের সামাজিক শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।