গত রাতের অপ্রত্যাশিত প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে লিবিয়ার ত্রিপোলি শহরের দক্ষিণাঞ্চলে এক মুহূর্তে বিশাল বন্যা সৃষ্টি হয়। বৃষ্টির তীব্রতা ও অব্যাহত প্রবাহের কারণে নদী ও নিকটবর্তী খালগুলো দ্রুত স্রোত বাড়িয়ে তুলেছে, ফলে সড়কপথের নিচে গড়ে ওঠা বিদ্যুৎ লাইনগুলো পানিতে নিমজ্জিত হয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এই পরিস্থিতিতে ত্রিপোলি শহরের বাসিন্দা রাশিদ আলী (৩২) তার বাড়ির সামনে গড়িয়ে পড়া বিদ্যুৎ তারের স্পর্শে মরণশীল আঘাত পেয়ে মৃত্যুবরণ করেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, রাশিদের মৃত্যু ঘটার মুহূর্তে তিনি তার সন্তানদের সঙ্গে বাড়ির সামনের বাগানে ছিলেন এবং হঠাৎ বিদ্যুৎ শক তার শ্বাসরুদ্ধ করে দেয়। এই দুঃখজনক ঘটনা ত্রিপোলি শহরের বাসিন্দা ও নিকটবর্তী এলাকার মানুষকে গভীর শোকের মধ্যে ফেলেছে।
বছরের শেষের দিকে লিবিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে হঠাৎ বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে; বিশেষ করে ত্রিপোলি শহরটি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অপ্রত্যাশিত বৃষ্টির কারণে বহুবার বন্যার শিকার হয়েছে। স্থানীয় জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, গ্লোবাল উষ্ণায়নের প্রভাবের ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন ঘটছে, যার ফলে ভূমধ্যসাগরের উপকূলে হঠাৎ বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়ছে। তদুপরি, শহরের পুরনো অবকাঠামো, বিশেষত অপ্রতুল নিকাশী ব্যবস্থা ও পুরনো বিদ্যুৎ লাইনগুলো, বন্যার সময় অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করে। পূর্বে একই অঞ্চলে ঘটিত বন্যা ও বিদ্যুৎ শকের ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া সত্ত্বেও, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের অভাব এখনও বিদ্যমান।
বন্যা ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ঘটনার পর ত্রিপোলি পৌরসভার মুখপাত্র হাবিব আল-সাইদা তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় রেসকিউ টিমগুলো দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেছে এবং মৃতদেহ উদ্ধার করে শহরের মেডিকেল সেন্টারে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। রাশিদের পরিবার থেকে পাওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, পরিবারটি শোকাহত হলেও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও প্রতিবেশীদের সহায়তায় কিছুটা সান্ত্বনা পেয়েছে। ত্রিপোলি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফারুক হোসেন বলেন, “এই ধরনের দুঃখজনক ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধের জন্য শহরের বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো গঠন ও বিদ্যুৎ লাইনগুলোর সুরক্ষিত স্থাপন অপরিহার্য।” স্থানীয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীও বন্যা-প্রতিরোধী পরিকল্পনা ও জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে।
অধিকর্তারা এখনো ঘটনাস্থলে জরুরি রেসকিউ ও পরিষ্কার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ত্রিপোলি পৌরসভার জরুরি পরিষেবা বিভাগ জানিয়েছে, বন্যা-প্রভাবিত এলাকায় অস্থায়ী শেল্টার স্থাপন করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। তদুপরি, বিদ্যুৎ সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ লাইনগুলো দ্রুত মেরামত করা হবে এবং ভবিষ্যতে বন্যা-প্রবণ এলাকায় লাইনগুলোকে উচ্চতর স্থানে পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকারী পরিকল্পনায় বন্যা-প্রতিরোধী সেচ ব্যবস্থা, ড্রেনেজ উন্নয়ন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা অপরিহার্য, যাতে ত্রিপোলি ও সমজাতীয় উপকূলীয় শহরগুলোতে পুনরাবৃত্তি ঘটমান বন্যা ও বিদ্যুৎ শকের ঝুঁকি কমানো যায়।