বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে জানিয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর শীর্ষ দশটি কারণের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে হৃদ্রোগ। এই তথ্যের প্রকাশনা আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নীতির পুনর্বিবেচনা ও জনস্বাস্থ্যের জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। হৃদ্রোগের কারণে প্রতি বছর প্রায় ১৭ মিলিয়ন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় তৃতীয়াংশের বেশি। বিশেষত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত বাড়ছে, যা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে, নতুবা ভবিষ্যতে মৃত্যুর হার আরও বৃদ্ধি পাবে।
ডব্লিউএইচওর এই গবেষণার পটভূমিতে রয়েছে দশ বছরের দীর্ঘমেয়াদী ডেটা সংগ্রহ, যেখানে ১৯৫টি দেশ ও অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পূর্বে ২০১০ সালে প্রকাশিত একই ধরণের প্রতিবেদনে হৃদ্রোগ দ্বিতীয় স্থানে ছিল, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক অনুশীলনের অভাব ইত্যাদি ঝুঁকি উপাদানের বৃদ্ধি ফলে এই রোগের হার দ্রুত বাড়ছে। এছাড়া, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়, ফলে বয়স্ক জনসংখ্যা অধিকতর প্রভাবিত হচ্ছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও মেটাবলিক সিনড্রোমের মতো সহ-রোগগুলোও হৃদ্রোগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, যা সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা কৌশলের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক ড. টোফিক আল-হাসান বলেছেন, “হৃদ্রোগের প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা গৃহীত করা জরুরি।” দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রী ডা. রেহানা বেগমও এ বিষয়ে জোর দিয়ে বলছেন, “সরকারি স্বাস্থ্য নীতি এখন থেকে হৃদ্রোগের প্রাথমিক স্ক্রিনিং, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল পর্যবেক্ষণকে অগ্রাধিকার দেবে।” স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. সাইফুল ইসলাম উল্লেখ করেন, “খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ও ধূমপান ত্যাগই হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর মূল চাবিকাঠি।” সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া মিশ্র, কেউ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন, আবার কেউই স্বাস্থ্যসেবার খরচ ও প্রবেশযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অধিকাংশ সরকার এখনই হৃদ্রোগ প্রতিরোধে নতুন নীতি প্রণয়ন শুরু করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আগামী ত্রৈমাসিকে জাতীয় স্তরে ‘হৃদ্রোগ মুক্ত বাংলাদেশ’ ক্যাম্পেইন চালু করবে, যেখানে বিনামূল্যে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা, পুষ্টি পরামর্শ ও শারীরিক ব্যায়ামের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। পাশাপাশি, শহর ও গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্য ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়িয়ে, প্রাথমিক সেবা সহজলভ্য করা হবে। ডব্লিউএইচওর সুপারিশ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে গবেষণা ও ডেটা শেয়ারিং বাড়ানো হবে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী চিহ্নিত করে সময়মতো হস্তক্ষেপ করা যায়। ভবিষ্যতে যদি এই পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে হৃদ্রোগের মৃত্যুহার কমে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করবে।